আধুনিক সভ্যতার রোগ হিসাবেই পরিচিত ক্যান্সার।বর্তমান বিশ্বে এই রোগের প্রকোপ বেড়েই চলেছে। আমরা হয়তো অনেকেই এর কারণ,লক্ষণ, প্রতিকার এমনকি চিকিৎসা নিয়েও অনেক তথ্য জানি। কিন্তু আমরা কি জানি এর আদি ইতিহাস? কে প্রথম করেন আবিষ্কার? কেই বা প্রথম নামকরণ করেন ক্যান্সার এর? চলুন আজকে জানি ক্যান্সারের প্রাচীন ইতিহাস

#ক্যান্সারযুগেযুগে
খ্রীস্টপুর্ব ৩০০০ সালে প্রাচীন মিসরে প্যাপিরাসে লিখিত প্রাচীন কিছু চিকিৎসা বিদ্যার বইয়ে এই রোগের প্রথম উল্ল্যেখ পাওয়া যায়। এতে প্রায় ৮ টি স্তন ক্যান্সারের উল্ল্যেখ পাওয়া যায়। পাকস্থলী ক্যান্সারের চিকিৎসায় বার্লি ও সেদ্ধ খেজুর এর মাধ্যমে চিকিৎসার কথাও এতে লিপিবদ্ধ পাওয়া যায়।

কিছুদিন আগে ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের একটি দল দক্ষিণ সুদানে প্রায় ৩২০০ বছরের পুরানো একটি কংকাল পান। এটি পরীক্ষা নিরীক্ষার পরে বের হয়ে আসে প্রায় খ্রীস্টপূর্ব ১২০০ বছর আগে ঐ ব্যক্তির মৃত্যু হয় এবং তার কারণ ছিলো অস্থিতে ছড়িয়ে পরা ক্যান্সার ( মেটাস্টেটিক ক্যান্সার)।

খ্রীস্টপূর্ব ১১০০ সাল থেকে খ্রীস্টপূর্ব ৫০০ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রাচীন চীনের চিকিৎসকরা টিউমার বা অস্বাভাবিক ক্ষতের চিকিৎসায় বেশ দক্ষতা অর্জন করে যা পরবর্তী সময়ে আর বিকশিত হয়। খ্রীস্টপূর্ব ২৫০ শতকে নেই চিং রচিত ” Yellow Emperor’s Classic of Internal Medicine ” গ্রন্থে প্রথম বারের মতো স্তন ক্যান্সারের সচিত্র বিবরণ পাওয়া যায়। ঐ গ্রন্থে চিকিৎসা পদ্ধতি হিসাবে ওষুধ, আকুপাংচার ও ধর্মীয় আচার এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

প্রাচীন ভারতে সনাতন ধর্মাবলম্বী দের পবিত্র গ্রন্থ রামায়ণে ক্যান্সার রোগ ও গলার টিউমারের চিকিৎসায় আর্সেনিক পেস্ট এর কথা উল্লেখ পাওয়া যায়।

খ্রীস্টপূর্ব ৩০০ বছর আগে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক হিসাবে পরিচিত হিপোক্রেটাস প্রথম লক্ষ্য করেন কিছু শিরা উপশিরা টিউমারের চারপাশে কাঁকড়ার মতো ছড়িয়ে গেছে। এর থেকেই এর নামকরণ হয় ” কারকিনোমা” (গ্রীক) পরবর্তিতে ল্যাটিন ভাষা থেকে ক্যান্সার শব্দের উৎপত্তি।

৫০ খ্রীস্টাব্দ – ১০০ খ্রীস্টাব্দ: এই সময়ের দিকে কিছু রোমান চিকিৎসক ক্যান্সার এর চিকিৎসা হিসাবে সার্জারীকেই প্রধান চিকিৎসা সিসাবে মনে করতেন। যদিও তারা মনে করতেন ক্যান্সার বারবার ফিরে আসে এবং তা অনিরাময়যোগ্য।

৫০০-১৪০০ খ্রীস্টাব্দ: এই সময়ের মাঝে পুরো ইউরোপ জুড়ে ছোটখাট টিউমার এর চিকিৎসার ক্ষেত্রে শল্য চিকিৎসা (surgery) বা পুড়িয়ে দেয়া (cautery) জনপ্রিয় হয়ে উঠে। তবে টিউমার বা ক্ষত বড় হলে আর্সেনিক যুক্ত কস্টিক পেস্ট এর প্রলেপ বা ফ্লেবেটমি (দূষিত রক্ত বের করে দেয়ার পদ্ধতি) খাদ্যাভাস, হারবাল মেডিসিনের ব্যবহার
শুরু হয়।

১৬০০-১৭০০ শতক: ডাচ্ শল্য চিকিৎসক Adria Helvetius স্তন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে lumpectomy/ mastectomy এর ধারণার জন্ম দেন। পরবর্তীতে জার্মান চিকিৎসক Johann Scultetus (1595-1645) প্রথমবারের মতো Total Mastectomy ( সম্পূর্ণ স্তন অপসারণ) করেন।

আরেক জার্মান চিকিৎসক Wilhelm Fabricus Hildanus (1560-1634) প্রথম বারের মতো স্তন ক্যান্সার সার্জারীতে lymph node excision করেন। মোট কথা এই সময়ে সার্জারি ব্যবস্থা বেশ উন্নতি লাভ করলেও এনেস্থিসিয়া ও অপারেশন পরবর্তী সংক্রমণের জন্য সার্জারি ছিলো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ।

১৭০০-১৮০০শতক : এই শতকে ক্যান্সার রোগ সংক্রান্ত বেশকিছু মতবাদ পাওয়া যায়, যা পরবর্তীতে এই রোগের গবেষণায় উল্ল্যেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

ক্রণিক ইনফ্লামেশন বা সহজে সারছে না এমন ক্ষত থেকেও যে ক্যান্সার হতে পারে, প্রথম বারের মতো এমন ধারণা দেন ডাচ্ বিজ্ঞানী Professor Bocrlaune .

অকুপেশনাল মেডিসিনের জনক Dr. Bernardino Ramozzini ১৭১৩ সালে স্তুন ও জরায়ু ক্যান্সার নিয়ে এক গুরুত্পূর্ণ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন, যা থেকে ক্যান্সারের সাথে হরমোন ও জীবন যাপন পদ্ধতির একটি জোড়ালো সম্পর্ক আছে বলে ধারণা পাওয়া যায়।

১৭৬১ সালে Dr. John Hill তার এক রিপোর্টে প্রথম বারের মতো তামাকের সাথে ক্যান্সারের যোগসূত্র আছে বলে ধারণা দেন, যা পরবর্তীতে ক্যান্সার গবেষণার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসাবে বিবেচিত হয়।

১৭৭৫ সালে লন্ডনে অবস্থিত Saint Bartholomew Hospital এর চিকিৎসক Dr. Percival Pott চিমনী শ্রমিকদের নিয়ে প্রকাশিত এক রিপোর্ট এ ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ক্যান্সারের মধ্যে একটি যোগসুত্রের ধারণা দেন। Occupational carcinogen এর তত্ত্ব এই ধারণা থেকেই জন্ম।
( চলবে……)

0